logo

Copyright ©2024 Jagannath University. All Rights Reserved

News

জবিতে ‘পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও বিশ্ব গণমাধ্যম: নৈতিক দায়বদ্ধতা ও আত্মপর্যালোচনা’শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত

  • Published
  • 30 Sep, 2026
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ‘পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও বিশ্ব গণমাধ্যম: নৈতিক দায়বদ্ধতা ও আত্মপর্যালোচনা’ (War in West Asia and World Media: Ethical Accountability and Introspection) শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের উদ্যোগে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত Mr. Jalil Rahimi Jahan Abadi, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূতের প্রেস সেক্রেটারি সোফিয়া কুতেপোভা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুইডেনের Uppsala University-এর Professor Dr. Gregory J. Simons।
স্বাধীন গণমাধ্যমকে সত্য ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে থাকতে হবে
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে ইরানের রাষ্ট্রদূত Mr. Jalil Rahimi Jahan Abadi পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের সময় গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক বা সামরিক পক্ষের প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে সত্য, ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক আইনের নীতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড অন্যায্য এবং পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমের একটি অংশ এসব কর্মকাণ্ডের পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করছে। গাজায় চলমান সংঘাতের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও তিনি পশ্চিমা গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করেন।
জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ৫১-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরান আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে। সংঘাতের বাস্তব পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং যুদ্ধের মানবিক প্রভাব তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক ও স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ইরান সফরের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক বিধিবিধান রক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যমকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
যুদ্ধের পেছনের মানবিক ট্র্যাজেডি গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে সেমিনার আয়োজনের জন্য ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, বিশ্বের দুটি প্রভাবশালী দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধকে কেবল সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর পেছনের মানবিক ট্র্যাজেডি, প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুত মানুষের গল্পও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গণমাধ্যমে তুলে ধরা প্রয়োজন।
উপাচার্য সংবাদমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে সত্য প্রকাশ, মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং ঘটনার যথাযথ প্রেক্ষাপট উপস্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বের বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে এর সত্যতা ও উৎস যাচাই করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অপপ্রচার ও ঘৃণামুক্ত দায়িত্বশীল সংবাদচর্চা বিশ্বজুড়ে শান্তি, সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
নৈতিক ও মানবিক সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, যুদ্ধ, গণমাধ্যমের আধিপত্য এবং নীতি-নৈতিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সেমিনার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ইরান ও ফিলিস্তিনের চলমান পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং যুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমের আইনি ও নৈতিক দায়িত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
যুদ্ধকে মানবতা ও সভ্যতার জন্য ধ্বংসাত্মক উল্লেখ করে তিনি নীতি-নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও আত্মপর্যালোচনার ভিত্তিতে সাংবাদিকতা চর্চার আহ্বান জানান। চলচ্চিত্র ও সংবাদ প্রতিবেদন মানবাধিকার ও মানবতার পক্ষে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেমিনারের আলোচনা শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং মিডিয়া চর্চায় আরও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করবে।
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ অপরিহার্য
বাংলাদেশে নিযুক্ত রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূতের প্রেস সেক্রেটারি সোফিয়া কুতেপোভা পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এবং এ বিষয়ে রাশিয়ার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন।
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য তথ্য যাচাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত সততা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক ও পাঠকদের কাছে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দিতে প্রতিটি তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন সেমিনারে উপস্থিত হতে না পারায় তাঁর পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন সোফিয়া কুতেপোভা এবং আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান।
বিশ্ব গণমাধ্যম ও পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুইডেনের Uppsala University-এর Professor Dr. Gregory J. Simons। তাঁর উপস্থাপনায় পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, গণমাধ্যমের ন্যারেটিভ এবং ‘প্যাক্স আমেরিকানা’র ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।
তিনি যুক্তি দেন, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাতকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, গ্লোবাল নর্থের মূলধারার গণমাধ্যমের একটি অংশ স্বাধীনভাবে ক্ষমতাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিকে বৈধতা দেওয়ার ভূমিকা পালন করছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ‘প্যাক্স ব্রিটানিকা’ ও ব্রিটিশ পাউন্ডের আন্তর্জাতিক প্রভাব হ্রাসের সঙ্গে বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার তুলনা করেন তিনি। রাশিয়া, চীন ও ইরানকে পরিবর্তনশীল ইউরেশীয় ও গ্লোবাল সাউথ ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
Professor Simons পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের সংবাদ পরিবেশনে ন্যারেটিভ নির্মাণ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা করেন। পাশাপাশি বিকল্প ও ডিজিটাল মিডিয়ার উত্থান প্রচলিত তথ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ফলে যুদ্ধ ও সংঘাতের সংবাদ পরিবেশনে প্রচলিত ন্যারেটিভের পাশাপাশি বিকল্প উৎস, তথ্য যাচাই এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক এবং আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ ইহসানুল কবীর।
অনুষ্ঠানে স্বাগত ও সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন সেমিনারের সভাপতি অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিসতার জাহান কবীর।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, রেজিস্ট্রার, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বিভিন্ন দপ্তরের পরিচালক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সহকারী প্রক্টরসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার শেষে একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়