জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আধুনিকায়নকৃত কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান রবিবার (৪ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে আধুনিকায়নকৃত এ মিলনায়তনের উদ্বোধন করা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুস সালাম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য জনাব হামিদুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন আধুনিকায়নকৃত কেন্দ্রীয় মিলনায়তন নির্মাণে সহযোগিতার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, এই মিলনায়তনের আগের অবয়ব কেমন ছিল, আমরা তা জানি। আজকে যাদের কল্যাণে এই মিলনায়তন আধুনিকায়ন হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও তাদের তত্ত্বাবধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একটি কিংবদন্তি নাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বাহাদুর শাহ পার্ক রয়েছে, যা বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি স্মারক। এই পার্ককে ঘিরে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড ছিল। আমরা ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কল্যাণে সেটি উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু বর্তমানে অবৈধ দখলদাররা পার্কটির সৌন্দর্য নষ্ট করছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।
উপাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি কর্পোরেশন ঢাকার বিভিন্ন মানুষের ফুটপাতে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাই বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পার্কটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হলে আমরা এর সৌন্দর্য রক্ষা করব এবং এটিকে একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্মারক হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে ব্যবহার করব।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন বলেন, বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের মমতাময়ী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২১ বছরেও এই বিশ্ববিদ্যালয় বঞ্চনার শিকার হয়েছে। ফ্যাসিবাদ পদে পদে আমাদের বঞ্চিত করেছে। এ কারণেই শিক্ষার্থীসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার দীর্ঘদিন ধরে একটি খেলার মাঠ থেকে বঞ্চিত ছিল। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত ধুপখোলা মাঠটি যদি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের একটি স্থায়ী সমাধান হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও শারীরিক-মানসিক বিকাশের জন্য একটি নিজস্ব খেলার মাঠ অত্যন্ত প্রয়োজন।
পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখার প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬ উৎসবের মাধ্যমে পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক আবহকে আরও সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত রাখার জন্য ফ্যাসিবাদবিরোধী চিহ্ন হিসেবে বিশ্বজিৎ চত্বর নির্মাণ করতে পারলে এটিকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় একটি সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি হবে। যুগ যুগ ধরে পুরান ঢাকাবাসীও এতে অংশগ্রহণ করবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এই চত্বরের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব প্রদান করবে।
তিনি আরও বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি পুরান ঢাকা ও বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, আধুনিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবেশ গড়ে তুলতে আমরা কাজ করে যেতে চাই।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুস সালাম বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক অডিটোরিয়াম অত্যন্ত জরুরি। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে এ কাজটি করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেছিলেন। এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শিক্ষার মান বৃদ্ধির মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সুনাম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে যে সামাজিক অবক্ষয় চলছে, এ সময়েও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। অতীতে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আমরা গণতান্ত্রিক পথে হাঁটা-চলা শুরু করেছি। এই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সকলকে খেয়াল রাখতে হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন ও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি আরও বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বিশ্বজিৎ চত্বর নির্মাণের বিষয়ে আমরা সহযোগিতা করব। বাহাদুর শাহ পার্কের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তরের বিষয়েও সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে ধুপখোলা মাঠকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ হিসেবে স্থায়ীভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতেও সহযোগিতা করা হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য জনাব হামিদুর রহমান বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়নকৃত অডিটোরিয়াম উদ্বোধন অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের বিকাশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে যে জায়গাটি রয়েছে, সেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে নিয়ে এসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জায়গাটি ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দীপ্তি চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বিভিন্ন দপ্তরের পরিচালক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জকসু’র নেতৃবৃন্দ, ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।




