জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) আবৃত্তি সংসদের আয়োজনে দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘৬ষ্ঠ আবৃত্তি উৎসব ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৩ আগস্ট ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এ উৎসবে আন্তঃবিভাগ নজরুল আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, গুণীজন সম্মাননা, পুরস্কার বিতরণ, আলোচনা সভা ও আবৃত্তি পরিবেশনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
উৎসবের উদ্বোধন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, এমপি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম দেশের সংস্কৃতি খাতকে পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে কুরুচিপূর্ণ চর্চা দূর করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোর নানা সংকটের কারণে বর্তমানে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে জাতি, ধর্ম ও গোষ্ঠী নির্বিশেষে একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে বর্তমান সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, দেশের সংস্কৃতি খাতকে পুনরুজ্জীবিত ও পরিশীলিত করার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিক। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের ইতিহাস এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনৈতিক সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করে তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও পরিশীলিত চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বলেন, রাজনৈতিক ভাষাচর্চা থেকে কুৎসিত ও অশালীন রূপ দূর করে একটি পরিশীলিত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় দেশের ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পুনর্নির্মাণ ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সঙ্গে রাষ্ট্র পুনর্নির্মাণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশকে মর্যাদাশীল অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্বোধনী বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন বলেন, পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও জাতি গঠন ও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে দেশের সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, জবি আবৃত্তি সংসদ সারা বছরব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন, এমপি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন বলেন, আবৃত্তি শুধু শুদ্ধচর্চার বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও প্রতিবাদী চেতনা জড়িয়ে রয়েছে। ভাষা ও আবেগের যথাযথ সম্মিলন মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। শব্দ যখন হৃদয়ে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে, তখন মানুষ অন্যায় ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, কথা বলার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আবৃত্তি হচ্ছে কথা বলার ধরন ও কণ্ঠের সঠিক ব্যবহার শেখার অন্যতম উৎকৃষ্ট মাধ্যম। তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আবৃত্তিচর্চার বিকল্প নেই। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবৃত্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, শুধু কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ‘মার্কেট রেডি’ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করলেই হবে না; একই সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চা একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জবি আবৃত্তি সংসদের ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা কামরুল ইসলাম জুয়েল। জবি আবৃত্তি সংসদের প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রমের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাবেক ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোঃ মহিউদ্দিন ফরিদ।
অনুষ্ঠানে দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও কবি আবদুল হাই শিকদারকে ‘কবি সম্মাননা জবিয়ান পদক’ এবং বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী মুন্সী মোঃ রেজাউল হোসেইন টিটোকে ‘আবৃত্তিশিল্পী সম্মাননা জবিয়ান পদক’ প্রদান করা হয়।
নজরুল বর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে সকালে আয়োজিত আন্তঃবিভাগ আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এইচ এম ফাহিম। এ ছাড়া এর আগে অনুষ্ঠিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝেও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। ওই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খিজির ফাইয়াজ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জবি আবৃত্তি সংসদের সভাপতি আবিদুল হক রাহাত ও সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মারুফা আক্তার লিজা। এছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসেত বক্তব্য দেন।
দিনব্যাপী আয়োজিত এ উৎসবের শেষ পর্বে আমন্ত্রিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা আবৃত্তি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠান শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের চত্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কতৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষনা ফলকের সামনে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী সম্মাননা প্রদর্শন করেন।



