logo

Copyright ©2024 Jagannath University. All Rights Reserved

News

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত

  • Published
  • 06 Aug, 2026
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আয়োজনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র, তরুণ ও সাধারণ জনগণের সাহসী ভূমিকা ও আত্মত্যাগ স্মরণ করতেই এ আয়োজন। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের অর্জন কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। এ আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সাহসী ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা ও গর্ব প্রকাশ করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ন্যায়, নৈতিকতা, সমতা ও বৈষম্যহীনতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ও সমাজ গড়ে উঠবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণ ও মেধাবী পরিবারের সন্তান উল্লেখ করে তিনি তাদের জন্য সমতাভিত্তিক ও ন্যায়সংগত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া, ব্যবসা এবং দেশে-বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে উল্লেখ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অতীতের বঞ্চনা ও ক্ষতকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আত্মত্যাগকারীদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সাজিদ ভবনের নিচতলায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আলোকচিত্র প্রদর্শনী’র উদ্বোধন করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। ‘আলোকচিত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’ শীর্ষক এ প্রদর্শনীতে আলোকচিত্রী ও সাহসী ফটোসাংবাদিক জীবন আহমেদের জুলাই আন্দোলনের চিত্রমালাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্বভাবে সংগৃহীত বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সারসংক্ষেপ নিয়ে ‘ফিরে দেখা: রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার ২০২৪’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক অধ্যাপক ড. নছির আহমাদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোঃ শেখ গিয়াস উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে শহীদ একরামুল হক সাজিদের মাতা লিপি বেগমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা গ্রহণ করে তিনি শহীদ সন্তান ও পরিবারের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন এবং তাঁর সন্তানসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত সকলের হত্যার বিচার দাবি করেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল, জবি ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন, জবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অর্জন থাকলেও দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলায় প্রত্যাশিত সাফল্য ও প্রাপ্তি অর্জিত হয়নি। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অপ্রাপ্তি ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরলসভাবে কাজ করছে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে বিভিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং একটি হল নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় গড়ে তোলা হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তি দূর করতে সরকার ও ইউজিসির সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রশাসনকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও আপসহীনভাবে কাজ করতে হবে এবং অন্যায়, অবিচার ও যেকোনো অযাচিত চাপের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা ধারণ করে ন্যায়, মানবিকতা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে সবাইকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান উপাচার্য। একই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের পরিবারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, বৈষম্য, দুর্নীতি ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ। গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তিনি বলেন, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান, সংলাপ, সহনশীলতা, আইনের শাসন ও সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনে মনোযোগী হয়ে আন্দোলনের চেতনাকে দেশ গঠনের কাজে রূপ দিতে হবে। শুধু বক্তব্য নয়, প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করে শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অর্জনগুলো মূল্যায়নের পাশাপাশি আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ জরুরি। গণঅভ্যুত্থান ছিল সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন; তাই এর অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মালিকানায় পরিণত করা উচিত নয়। বিভাজন, অহংবোধ, অসহিষ্ণুতা ও আক্রমণাত্মক ভাষা পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। গুজব নয়, সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, চরিত্র ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রকৃত উন্নয়নের শর্ত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জবি ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একদিন বা এক মাসের ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মেধার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং কোনো মায়ের বুক আর খালি না হয়, সে লক্ষ্যে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও অন্যায়মুক্ত ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
জবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অর্জন হলো ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া এবং নতুন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে একটি নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।
জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক বলেন, আমাদের সাজিদের মৃত্যু ছিল গর্বের-এক সাজিদ নাই কিন্তু শত শত সাজিদ তৈরি করে গিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আমাদের প্রতিজ্ঞা হতে হবে সকল প্রতিষ্ঠান মেধার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
অনুষ্ঠানে এক পর্যায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৬ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থী ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৈয়বা হাসান, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন রসায়ন বিভাগের সাফায়েত হোসেন এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মিজানুর রহমান। শিক্ষক ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ইব্রাহীম খলিল। কর্মকর্তা ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন সহকারী রেজিস্ট্রার আনোয়ার হোসেন, দ্বিতীয় হন ডেপুটি রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আবদুল খালেক এবং তৃতীয় হন সহকারী রেজিস্ট্রার মাসুদা আক্তার। কর্মচারী ক্যাটাগরিতে চাঁন মিয়া পুরস্কৃত হন।
অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বিএনসিসির পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বিভিন্ন দপ্তরের পরিচালক, শিক্ষক, জুলাই যোদ্ধা, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং অন্যান্য অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।