জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্বাস করে, মতপার্থক্য বা দাবি-দাওয়া গণতান্ত্রিক উপায়ে উপস্থাপন করা যেতে পারে; কিন্তু এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা সমীচীন নয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (৫ আগস্ট ২০২৬) মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে তাঁর কনফারেন্স কক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সভায় লালবাগ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) নাজিম উদ্দিন, কোতোয়ালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ফজলুর রহমান, কোতোয়ালী, সূত্রাপুর, বংশাল ও লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মাননীয় উপাচার্য সকলকে সর্বোচ্চ ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও নতুন বাস্তবতায় পারস্পরিক সংঘাত নয়, বরং সংলাপ, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির চর্চাই হওয়া উচিত। তিনি বলেন, সংঘাত কখনো শান্তি বয়ে আনে না; বরং তা কেবল বিভাজন ও অস্থিতিশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রসংগঠন ও অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ১৩টি সমন্বয় সভা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও সবাইকে সঙ্গে নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চান।
ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবির বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য:
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তিনটি দাবির বিষয় উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান নিম্নরূপ—
১. দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন করার দাবি
প্রশাসন জানায়, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রথম পর্যায়ের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চলমান রয়েছে এবং এ পর্যায়ের কাজ আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি; এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও একনেকের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২. অস্থায়ী আবাসনের দাবি
গত বছর যমুনা আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অস্থায়ী আবাসনের একটি প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা অনুমোদিত হয়নি। কারণ, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ চলমান থাকায় সরকার স্থায়ী আবাসন নির্মাণকেই অধিক যৌক্তিক বিবেচনা করেছে।
বর্তমান উপাচার্য মহোদয়ের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় গত ২১ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছে, যা স্থায়ী আবাসিক ভবন নির্মাণের নির্দিষ্ট কোডে বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারি আর্থিক বিধি অনুযায়ী এ অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যয় করার আইনগত সুযোগ নেই। এই বরাদ্দকৃত টাকায় কাঙ্খিতমানের ভবন নির্মাণ সম্ভব নয় বলে বর্তমান প্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আরও ৮ কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন করেছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানায় যে, দরপত্র সম্পূর্ণভাবে ই-জিপি (e-GP) পদ্ধতিতে আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে যোগ্য যে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করতে পারে। ইতোমধ্যে ১২টি দরপত্র জমা পড়েছে এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান। কোনো ঠিকাদারকে এখনো কাজ প্রদান করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতিতে অটল এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনে একটি মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া যাচাই করা হবে। দুর্নীতি বা অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।
৩. মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক নিয়োগ ও সেবার মানোন্নয়ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সেবার উন্নয়নে বর্তমান প্রশাসন ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা করেছে। এর ফলস্বরূপ বিশেষ বিবেচনায় তিন থেকে চারটি নতুন চিকিৎসক পদের অনুমোদন হয়েছে। প্রশাসন আশা করছে, প্রয়োজনীয় নিয়োগ সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত হবে।
প্রশাসনের আহ্বান
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিমত, শিক্ষার্থীদের যে কোনো যৌক্তিক দাবি আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলে তা আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূরীকরণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
বর্তমান প্রশাসন *"টিম জগন্নাথ"*-এর চেতনায় বিশ্বাস করে। বিভাজন, অপপ্রচার, গুজব কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সংশ্লিষ্ট সবার মনোবল ক্ষুণ্ন করে। তাই অহেতুক উত্তেজনা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে যুক্তি, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি প্রশাসন আহ্বান জানাচ্ছে।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গৃহীত সিদ্ধান্ত
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে আজকের সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে—
১. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সার্বক্ষনিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) সঙ্গে রাখবে।
২. কোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সজাগ থাকবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশা করে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন এবং একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করবেন।




