logo

Copyright ©2024 Jagannath University. All Rights Reserved

News

জবিতে ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

  • Published
  • 26 Jul, 2026
ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখার উদ্যোগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জনাব জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবন করতে হলে দেশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় পরিচয়কে ভিত্তি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পরবর্তীতে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক রূপ লাভ করে। এর ধারাবাহিকতায় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ সুগম হয়। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে, একটি জাতির পরিচয় নির্ধারণে কেবল ধর্মীয় পরিচয় যথেষ্ট নয়; ভাষা, সংস্কৃতি, অধিকার ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও জাতিসত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
মন্ত্রী মহোদয় বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের সাহসী ভূমিকা ও স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে যুদ্ধের পথে এগিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা জুগিয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে সামরিক প্রতিরোধের সূচনা মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে প্রবাসী সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠিত সামরিক কাঠামোর মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগ্রাম আরও সুসংগঠিত হয় এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালের ধর্মভিত্তিক জাতীয় পরিচয় যেমন টেকসই হয়নি, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের বহুমাত্রিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর দর্শন প্রবর্তনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের ধারণা সামনে আনেন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল দর্শন হলো বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিকের অভিন্ন পরিচয় ‘বাংলাদেশি’। এই পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের সকল মানুষের বৈচিত্র্যকে ধারণ করেই এই জাতীয়তাবাদের বিকাশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ, বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও নৃগোষ্ঠীর মানুষ এই অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের অংশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়; এটি দেশের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয়ের ধারণা। এই দর্শনের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করা সম্ভব। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অমানবিক নির্যাতনে দেশের মানুষ যখন দিশেহারা, তখন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। শুধু ঘোষণা দিয়েই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি; মুক্তিযুদ্ধের সামরিক প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
উপাচার্য বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকার মধ্য দিয়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ, একটি মানচিত্র, একটি ভূখণ্ড ও স্বাধীনতার চেতনা পেয়েছি। বাংলাদেশের সংকটময় সময়ে তিনি পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে জাতিকে ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় পথ দেখানোর জন্য তিনি যে দর্শন রেখে গেছেন, সেটিই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও পরবর্তী সময়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শহীদ জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
উপাচার্য আরও বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি, অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করেছেন এবং সবুজ বিপ্লবের ধারণাকে এগিয়ে নিয়েছেন। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনকে ধারণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দর্শনের আলোকে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। তিনি দেশের গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনাব হামিদুর রহমান হামিদ, এমপি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান জাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করে দলমত-নির্বিশেষে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, বাংলাদেশের সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করলে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তা ও অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন প্রবর্তন করেন, যা দেশের সকল নাগরিকের অধিকার ও স্বাতন্ত্র্যকে ধারণ করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর প্রবর্তিত রাজনৈতিক দর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোঃ শামছুল আলম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইউট্যাব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। স্বাগত বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক। ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউট্যাব জবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ও বহিরাঙ্গন কার্যক্রম পরিচালক অধ্যাপক ড. নাছির আহমাদ। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল আজম সওদাগর ও সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ।
এছাড়াও সেমিনারে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোঃ আজম খান, অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম, ইউট্যাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. মোঃ আনিসুর রহমান, ইউট্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোঃ নঈম আকতার সিদ্দিক, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি জিয়া উদ্দিন বাসেত এবং জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সেমিনারটি শুরুর পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের চত্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কতৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষনা ফলকের সামনে মাননীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী সম্মাননা প্রদর্শন করেন এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ সংলগ্ন মাঠের পাশে দুটি বৃক্ষের চারা রোপন করেন।