জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) লাইব্রেরি ব্যবহারকারী কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও ক্যারিয়ার গঠনে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সকল শিক্ষার্থী এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদকের উদ্যোগে শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ শিক্ষার্থী ইকরামুল হক সাজিদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, এমপি, মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, এমপি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক ও নাভানা ফার্মার সিইও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সুরুজ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী পরিচালক কামরুজ্জামান দুলাল।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক।
অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী শহিদ হয়েছেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হয়েছিল। তবে সময় যত অতিবাহিত হচ্ছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ততই বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাই সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে লাইব্রেরিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ডকুমেন্টেশন তৈরির কাজ চলছে। এটি করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। তারপরও যথাযথ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জুলাইয়ের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির উন্নয়ন প্রসঙ্গে উপাচার্য মহোদয় বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ে লাইব্রেরির উন্নয়নে যতটুকু কাজ করা সম্ভব হয়েছে, তা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা অনুযায়ী লাইব্রেরিকে আরও উন্নত ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য সকল বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ বলেন, যারা নিজেদের ক্যারিয়ারে সফল হয়েছেন, তাঁদের সাফল্য যেন শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থাকে। দেশ ও জাতির কল্যাণে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার পরিধি আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বলেন, কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্মাননা জানানোর এ ধরনের আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ে আমরা গর্বিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় অতীত ও ঐতিহ্য। তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁরা যেন বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান এবং তাঁদের সহযোগিতা করেন। বর্তমান উপাচার্যের দক্ষ নেতৃত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আরও এগিয়ে যাবে বলেও তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।তিনি আরও বলেন, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনকে সমানভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অনন্য। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং তাঁদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী সন্তানদের স্বীকৃতি দিতে পারা আনন্দের বিষয়। তবে এই স্বীকৃতি যেন তাঁদের স্বপ্নের শেষ ধাপ না হয়। ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা ও পরিশ্রম করে যেতে হবে। জীবনে সফল হতে হলে অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের একটি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক মো. রিয়াসাল রাকিব। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জুলাই আন্দোলনের জবি সংগঠক এস. এইচ. মুন্না। অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি কাজী বাসেতসহ অন্যান্য অতিথি ও ছাত্রনেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়ের ৬৩ জন কৃতি শিক্ষার্থীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁরা বিসিএসসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পেশায় দায়িত্ব পালন করে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সংবর্ধিত কৃতি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ তাঁদের শিক্ষাজীবনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে নিয়মিত অধ্যয়ন ও ক্যারিয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। লাইব্রেরির নিয়মিত ব্যবহার এবং পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে ভালো ফলাফল ও পেশাগত সাফল্য অর্জনকারী এসব শিক্ষার্থীর স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষার্থীদেরও লাইব্রেরিমুখী করা এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কৃতি শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে তাঁদের শিক্ষাজীবন, লাইব্রেরিতে অধ্যয়ন, বিসিএস ও অন্যান্য চাকরির প্রস্তুতি এবং কর্মক্ষেত্রে সফলতার অভিজ্ঞতা বর্তমান শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁদের সাফল্যের গল্প ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্তমান শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে অনুপ্রেরণা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।




