logo

Copyright ©2024 Jagannath University. All Rights Reserved

News

জবিতে ‘ফিরে দেখা ছাত্র জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

  • Published
  • 20 Aug, 2026
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইতিহাস বিভাগের আয়োজনে ‘ফিরে দেখা ছাত্র জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৯ আগস্ট ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদ কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. নাছির আহ্‌মাদ।
সেমিনারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন বলেন, ‘ফিরে দেখা ছাত্র জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’—শীর্ষক সেমিনারের নামটিই শিহরণ জাগায় এবং জাগরণের বার্তা বহন করে। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ সাজিদসহ সকল শহিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আন্দোলনে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; দীর্ঘ প্রায় ১৫-১৬ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের ধারাবাহিক প্রতিরোধ ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়।
উপাচার্য বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে অধিকারবঞ্চিত মানুষের একটি অংশ ন্যায্য অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকলেও তারা বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ফ্যাসিবাদী সময়ে যারা ন্যায্য কথা বলার চেষ্টা করেছেন, তাদেরও নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একপর্যায়ে মানুষ উপলব্ধি করে যে অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া বেঁচে থাকার পথ নেই। ফলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। তিনি বলেন, কোটা ব্যবস্থা মেধার স্বাভাবিক বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পর্যায়ক্রমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে এক দফা দাবির মধ্য দিয়ে তা সার্বজনীন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। এ আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি; ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সার্বজনীন রূপ লাভ করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের তুলনা করে উপাচার্য বলেন, ১৯৭১ সালে দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল এবং আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন করেছি। কিন্তু পরবর্তীতে সেই স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল ও অধিকার সব মানুষের জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষ বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার রক্ষার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
উপাচার্য আরও বলেন, যে কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, সেই কারণগুলো যেন আর কখনো ফিরে না আসে—এ বিষয়ে সমাজে জনমত তৈরি করতে হবে। অধিকার ও ন্যায়ের প্রশ্নে সবাইকে আপসহীন থাকতে হবে। দেশ ও সমাজকে উন্নত করতে হলে প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার ২১ বছর অতিক্রান্ত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। এর পেছনেও নানা সময়ে ফ্যাসিবাদী শক্তির কালো থাবা ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কাজ করেছে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এখন কাজ করার সময়। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। যারা কথায় কথায় বিভিন্ন অধিকারকে সামনে এনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘ট্রামকার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে, তারা বাস্তবে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কতটুকু কাজ করেছে—সে বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে।
উপাচার্য বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরে গঠনমূলক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছেন। কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে সবাইকে নিয়ে ‘টিম জগন্নাথ’ হিসেবে কাজ করতে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঠিক ও তথ্যভিত্তিক ইতিহাস সমাজের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে। এ আন্দোলনকে জনযুদ্ধে রূপ দেওয়ার একটি ধারণাও তখন সামনে এসেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী একটি ঘটনা। তাই এ ঘটনাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এর ওপর একাডেমিক আলোচনা ও গবেষণা প্রয়োজন। তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে দেশের মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার মধ্যে ছিল। বিশেষ করে বেকারত্বের সমস্যা, কোটা ব্যবস্থা এবং সমাজের সর্বস্তরে কাঠামোগত চাপ মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এর পাশাপাশি গণতান্ত্রিক শূন্যতাও তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ট্রেজারার বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সফলতা তখনই আসবে, যখন জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ন্যায়বিচারভিত্তিক ও মানবিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে আর কোনো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন হবে না।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাসান মফিজুর রহমান। সেমিনারে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জুলাই যোদ্ধা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।