প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, এমপি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামজ্জুমান সুরুজ, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু, বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোরতাজুল করিম বাদরু, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব কামরুজ্জামান দুলাল, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিদাতা কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর নাতবৌ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ সাজিদের মা। তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনন্য অবদান রয়েছে। ১৯৯৫ সালে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় এ দাবিটি পুনরায় উত্থাপিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে জগন্নাথ কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অনেক সময় জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সব সরকারের ভালো কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা উচিত। সবার আগে বাংলাদেশ, জনগণ ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের পাশাপাশি এর শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। একুশ বছরের তারুণ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, আশা করি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঁচিশ বর্ষপূর্তি আরো অনেক জাঁকজমকপূর্ণ হবে। বিএনপি সরকার অতিদ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষা। উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জন কিংবা কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার্থী তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় হবে গবেষণা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তাঁরা নিজেদের জ্ঞান ও মেধার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে পারেন।
তিনি বলেন, শুধু জিপিএ-৫ কিংবা উচ্চশিক্ষার সনদ অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি উন্নত হতে পারে না। শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরিবর্তে নিজের যোগ্যতা, আগ্রহ ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হবেন, তাঁদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও যুগোপযোগী করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। শুধু প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। ভবিষ্যতের শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে যেসব শিল্পের জন্য দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরুণদের প্রস্তুত করতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় সক্ষম জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জ্ঞানভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের বাংলাদেশের জন্য একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবাইকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দীন অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি, আমন্ত্রিত অতিথি এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে প্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে তাঁরই সন্তান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এ অবস্থায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি। উপাচার্য আরও বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব সাবেক শিক্ষার্থী বর্তমানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং যাঁরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন, শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বঞ্চনাকে প্রাপ্তিতে পরিণত করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
এ সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এছাড়া আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথিবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ, ইউট্যাব জবি শাখার সভাপতি, জকসুর সভাপতি, কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি, কর্মচারী সমিতি ও সহায়ক কর্মচারী সমিতির নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন।
দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, আমন্ত্রিত অতিথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।




